মানুষের অস্তিত্বের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেছেনঃ
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
"আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।" (সূরা আয-যারিয়াতঃ ৫৬)
প্রচলিত ধারায় 'ইবাদত' শব্দটিকে কেবল নির্দিষ্ট কিছু আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। কিন্তু ইসলামী দর্শনের গভীরতর বিশ্লেষণ করলে, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরিচালিত প্রতিটি কল্যাণকর কাজই ইবাদত। এই প্রবন্ধের মূল ভিত্তি হলোঃ যখন একজন মুমিন তার কর্মস্থলকে আল্লাহর উপস্থিতির জায়গা হিসেবে বিবেচনা করে এবং ইসলামি শরিয়াহর নীতিমালা মেনে চলে, তখন সেই কর্মক্ষেত্র মসজিদের মতোই পবিত্র ইবাদতগাহে রূপান্তরিত হয়।
ইসলামের মূল নির্যাস হলো 'ইহসান' বা আল্লাহকে সর্বদা উপস্থিত মনে করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইহসানের ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ
أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ
"তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করো যেন তুমি তাঁকে দেখছ; আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে জেনে রেখো তিনি তোমাকে দেখছেন।" (সহিহ বুখারি)
এই 'ইহসান' যখন কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তখন একজন কর্মী কাজে ফাঁকি দিতে পারে না। কারণ তিনি জানেন, তার বস তাকে না দেখলেও তার স্রষ্টা তাকে দেখছেন। আহলুল বাইয়েতের অন্যতম ইমাম, ইমাম জাফর আস-সাদিক (আ.) শ্রমিকের মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন যে, উপার্জনের জন্য কষ্ট করা জিহাদের সমতুল্য। কর্মক্ষেত্রে শ্রম দেওয়া কেবল অর্থ উপার্জন নয়, বরং এটি নফসের বিরুদ্ধে এক প্রকার সংগ্রাম।
ইসলাম কর্ম ও প্রার্থনাকে আলাদা দুটি খোপে বন্দি করেনি। বরং প্রার্থনা থেকে প্রাপ্ত শক্তিকে কর্মে রূপান্তরের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ বলেনঃ
فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ
"অতঃপর সালাত শেষ হলে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (রিজিক) সন্ধান করো।" (সূরা আল-জুমুআ: ১০)
এখানে 'ছড়িয়ে পড়া' এবং 'রিজিক সন্ধান করা'র নির্দেশটি সালাত বা নামাজের ঠিক পরেই দেওয়া হয়েছে। এটি একটি শক্তিশালী রূপক—নামাজে আমরা আল্লাহর সামনে দাঁড়াই আধ্যাত্মিক শক্তির জন্য, আর কর্মক্ষেত্রে সেই শক্তি দিয়ে আমরা সততার স্বাক্ষর রাখি। মসজিদের জায়নামাজ এবং কর্মস্থলের ডেস্ক—উভয়ই মুমিনের জন্য সেজদাহর জায়গা; একটি শারীরিক, অন্যটি চারিত্রিক।
বর্তমান করপোরেট সংস্কৃতিতে 'Efficiency' বা দক্ষতার কথা বলা হলেও 'Integrity' বা সততার বড় অভাব। কাজের ফাঁকি, ঘুষ, এবং অস্বচ্ছতা পেশাদারিত্বকে কলুষিত করেছে। এর কারণ হলো মানুষ কাজকে কেবল 'জাগতিক' বা দুনিয়াবী বিষয় মনে করে।
অথচ ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী হালাল উপার্জন ফরজ ইবাদতের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে এসেছেঃ
طَلَبُ كَسْبِ الْحَلالِ فَرِيضَةٌ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ
"হালাল জীবিকা অন্বেষণ করা (অন্যান্য) ফরজ ইবাদতের পর একটি ফরজ।" (বায়হাকি)
যদি আমরা কর্মক্ষেত্রকে মসজিদের মর্যাদা দেই, তবে সেখানে মিথ্যা বলা বা কাজে অবহেলা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। এটিই হবে আধুনিক 'Work Ethics'-এর সবচেয়ে বড় সমাধান। যখন কোনো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা সাধারণ শ্রমিক তার কাজকে আল্লাহর প্রতি নিবেদিত উপাসনা মনে করবেন, তখন সেবার মান এবং নৈতিকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছাবে।
যদি আমরা কর্মক্ষেত্রকে মসজিদের মর্যাদা দেই, তবে আধুনিক 'Work Ethics'-এর সংকটগুলো নিমোক্ত উপায়ে সমাধান হবেঃ
ফাঁকি ও সময়ানুবর্তিতাঃ মসজিদে জামাতে নামাজ পড়তে যেমন সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম, কর্মক্ষেত্রেও সময়ানুবর্তিতা তখন একটি ধর্মীয় আবশ্যকতা হয়ে দাঁড়াবে।
দুর্নীতি ও খোদাভীতিঃ মসজিদের ভেতরে মানুষ যেমন পাপ কাজ করতে লজ্জিত হয়, তেমনি কর্মস্থলে 'ইহসান' (স্রষ্টা আমাকে দেখছেন) এই চেতনা থাকলে দুর্নীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
পারস্পরিক শ্রদ্ধাঃ আহলুল বাইয়েতের শিক্ষা হলো সৃষ্টির সেবা। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মী ও সেবাগ্রহীতাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন তখন কেবল শিষ্টাচার নয়, বরং আধ্যাত্মিক বাধ্যবাধকতা হয়ে উঠবে।
পরিশেষে, কর্মক্ষেত্রকে 'দ্বিতীয় মসজিদ' মনে করার দর্শনটি কেবল একটি আবেগীয় শব্দ নয়, বরং এটি একটি বৈপ্লবিক জীবনদর্শন। এটি আমাদের শেখায় যে জীবন দ্বিখণ্ডিত নয়। মসজিদের মেহরাবে যে খোদাভীতি আমরা অর্জন করি, অফিসের ফাইলে সই করার সময়ও সেই একই খোদাভীতি বজায় রাখতে হবে। এই আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলাই পারে একটি দুর্নীতিমুক্ত ও সমৃদ্ধ সমাজ উপহার দিতে। মানুষের সেবার মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনই হোক আমাদের জীবনের মূল লক্ষ্য।
